মলয় দে নদীয়া:-
বৃক্ষ প্রেমিক জীবনানন্দের ভাষায় সহসাই মূর্ত হয়েছে, বসেছে বালিকা খর্জ্জুরছায়ে নীল দরিয়ার কূলে।
শীত ঋতু এলেই গ্রামীণ সংস্কৃতিতে খেজুর রসের কথা মনে পড়ে। ফোঁটা ফোঁটা সঞ্চিত রস নির্গত হবে চোং দিয়ে। হাঁড়িতে জমে রসের ফোঁটা। এভাবে একটি গাছ দৈনিক গড়ে ৫-৬ লিটার রস দিয়ে থাক। কথিত আছে ‘খালি কলসি রেখে দিলে ভরে যায় রসে, সেই রসে দিয়ে জ্বাল মন ভরে সুবাসে’। আবার গাভীর সাথে তুলনায় বলা হয় ‘মাইট্যা গোয়াল কাঠের গাই-বাছুর ছাড়া দুধ পাই’। কাকডাকা ভোরে খেজুরের রস, মন মাতানো ঘ্রাণ শহরে বিরল। শীতের সাকালে খেজুর রস, মিষ্টি রোদ, কৃষক-কৃষাণির হাসি দারুণ প্রাণশক্তি। কবির ভাষায়, ‘এমন শীতলমিষ্টি কোথা আছে নীর? পান মাত্র তৃষিতের জুড়ায় শরীর’। তাই এ গাছকে অনেকে শখের বসে ‘মধুবৃক্ষ’ বলে থাকে।
নভেম্বরের মাঝামাঝি অর্থাৎ অগ্রহায়ণ থেকেই যারা গাছ কাটেন গাছী বা শিউলিরা খেজুর গাছ কাটা শুরু করে দেন। একটা খেজুর গাছ তিনবার কাটার পর তাতে নলি লাগিয়ে রসের জন্য ভাঁড় পাতা হয়। একটা খেজুর গাছ থেকে দিনে দু’বার রস মেলে। একবার কাটার ফলে 5 দিন পর্যন্ত ঝরতে থাকে রস । দু দিন বিরতি দিয়ে আবারও কাটা হয় গাছ । গোলাকার কান্ডে গতবছর যেদিক কাটা হয়েছিলো, এবছর ঠিক তার উল্টো দিকে কাটা হয়, আর সেই খাঁজে পা রেখে একদিকে বড় গাছে যেমন উঠতে সুবিধা হয় তেমনি গাছের বয়স সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা যায়। রসকে জিরেন এবং বিকালের রসকে ওলা বলে। পৌষ মাসে পুরোদমে রস মেলার পর মাঘ থেকে রস কমতে শুরু করে। ওই সময়ে রসের ঘনত্ব বাড়ে। তবে গাছকাটার পর প্রথম দিকের রসে গুড় ভাল হয়।
শুধুই কি রস?কুটির শিল্পে খেজুরের পাতার ব্যাপক ব্যবহার ও কদর রয়েছে। খেজুর পাতা দ্বারা তৈরি করা রকমারি হাত পাখা, লছমি, ঝাড়–, ঝুড়ি, থলে, ছিকা ও নানা রকম খেলনা এখনও অতি সমাদৃত। খেজুর পাতার পাটির কদর ঘরে ঘরে।
খেজুর ফুল ভিন্নবাসী, পুষ্পমঞ্জরি দেখে পুরুষ ও স্ত্রী গাছ চিহ্নিত করা যায়। শুধু স্ত্রী গাছে ফুল ও ফল ধরে পুং গাছে নয়। তবে রস সংগ্রহ করা যায় উভয় ক্ষেত্রেই। পুং পুষ্পমঞ্জরি খাটো, স্ত্রী পুষ্পমঞ্জরি লম্বা ও ফুলের বর্ণ সাদা।
এর ফলে পরেও থাকলো “ফল” সুমিষ্ট রসালো ফল ডাক্তারি পরিভাষায় পাচনতন্ত্র রক্ষাকারী।

