দীর্ঘদিন গৃহবন্দী কিশোর-কিশোরীদের বিষন্ন মনের প্রফুল্লতা ফেরাতে এবং নিজেকে খুঁজে পেতে অফুরন্ত গল্প শোনার পাঠশালা  ” আলোর ইসকুল “

দীর্ঘদিন গৃহবন্দী কিশোর-কিশোরীদের বিষন্ন মনের প্রফুল্লতা ফেরাতে এবং নিজেকে খুঁজে পেতে অফুরন্ত গল্প শোনার পাঠশালা
” আলোর ইসকুল ”

মলয় দে নদীয়া:- একসময় একান্নবর্তী পরিবারে এমনই বর্ষা মুখর দিনে, ঠাকুরমা ঠাকুরদাদার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাপূর্ণ গল্পে জ্ঞানের পরিপূর্ণতা লাভ করত পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত দিগগজ পন্ডিতও। পরিবারের অন্য সদস্যরাও একে অন্যের সমব্যাথী হয়ে উঠতেন। এখন সবই অতীত! নেই গল্প দাদুর আসর, ঠাকুরমার ঝুলি। অ্যান্ড্রয়েড নিয়ে ঘরের এক কোনায় মুখ বুজে অথবা বোকা বাক্সের সামনে সাংসারিক কূটকচালি দেখতে ব্যস্ত সকলে। হ্যাঁ গল্প শোনা খানিকটা বেঁচে আছে বটে তবে শুধুই অলৌকিক বিষয়ে, যার আধুনিক নামকরণ হয়েছে সানডে সাসপেন্সের মতো কিছু কানে শোনার অনুষ্ঠান। তবে সংসার, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রতিকার, ধৈর্য‍্য, শ্রদ্ধা সম্মান স্নেহ জ্ঞাপন এ ধরনের নানা গুণ আজ বিলুপ্তির পথে। দীর্ঘ লকডাউনে বন্ধ স্কুল! পড়াশোনা বলতে ইন্টার নেট ভরসা! আর তাতে কৌতুহলী কিশোর-কিশোরী মনের নানান রঙের ছবি বিষয় পন্ড করতে চলেছে মূল উদ্দেশ্য। দীর্ঘ লকডাউনে কর্মহীন পরিবারের অভাব-অনটন, অনঅভ্যাসগত ভাবে একসাথে থাকার একঘেয়েমি, বাড়িয়ে তুলেছে অধৈর্য অসহিষ্ণুতা। ফলের অল্পতেই ধৈর্যচ্যুতি হয় কিশোর-কিশোরীদের; বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। এই রকমই এক ঘটনায় মর্মাহত হয়ে নদিয়া শান্তিপুরে বেশ কিছু সুহৃদয় মানুষ কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ স্বাভাবিক চেতনা জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে আয়োজন করেছেন গল্পের আসর। সেখানে আগত ছাত্রছাত্রীরা লাজ লজ্জার কারনে অভিভাবকদের না বলতে পারা বন্ধুদের কাছে ব্যাঙ্গার্থক অথবা সুযোগের সদ্ব্যবহার করার ভয়ে তাদের মনের প্রশ্ন একটি চিরকুট-কাগজে নাম পদবী বিহীনভাবে জমা করেন আয়োজক শিক্ষকদের কাছে, আর তা নিয়ে আলোচিত হয় ছাত্র সমক্ষে এবং তা থেকে মুক্তি লাভের উপায়। কখনো কবিতার লাইন, কখনো গানের কথা, বা মনীষীদের বিখ্যাত উক্তি সরলীকরণের মাধ্যমে তাদের বোঝানো হয়। শেখানো হয়, শুধুই সমাজ গোল্লায় গেছে বলে না চেঁচিয়ে কিভাবে তা রোধ করা যায়। আলোচিত হয় এ বয়সে নানান কৌতুহলী বিষয় এড়িয়ে কীভাবে মনোনিবেশ করা সম্ভব, বন্ধুত্ব ভালোবাসা প্রেম নয়, আলোচনা করা হয় শারীরিক কামনা-বাসনা কীভাবে এড়ানো সম্ভব! কেমন করে শিক্ষক সমাজ এবং পরিবারের কাছে আরো প্রিয় হয়ে ওঠা যায় তা নিয়ে। আগত ছাত্রছাত্রীরা জানান ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়াগুলো দূরে সরিয়ে রাখলে কীভাবে অনেক বেশি কিছু পাওয়া যায় তার সুলুক-সন্ধান মেলে এই গল্পের আসর থেকে। প্রতি সপ্তাহে একটি করে গল্পের আসর আয়োজিত হয় শান্তিপুরের বিভিন্ন গ্রাম এবং শহরভিত্তিক স্কুল, ক্লাব ঘরে বা বারোয়ারী প্রাঙ্গণে । প্রথম দিন যারা এসেছিলেন যাদের বেশিরভাগই উপস্থিত ছিলেন আজকের নবম দিনের গল্পের আসরে। আর এভাবেই ক্রমশ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে গল্প শুনতে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা। অভিভাবকরাও হতবাক এই গল্পথেরাপিতে। এত সহজে , মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে যে তাদের জন্ম দেওয়া সন্তান সন্ততিদের অন্যেরা অধিকারবশত চিন্তা চেতনা মননে পরিবর্তন ঘটিয়ে মূল লক্ষ্যে পৌঁছে দেবার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন তাদের সাধুবাদ জানিয়েছেন।