জলপাইগুড়ি সায়ন সেন :: জলপাইগুড়ি কলাকুশলী র অনবদ্য নাটক গনশা পরিবেশিত হল রবীন্দ্র ভবন মন্ঞ্চে। কোভিড কালের কঠিন সময় পেরিয়ে জলপাইগুড়ি কলাকুশলী আবার মঞ্চে ফিরলো তাদের সাম্প্রতিকতম প্রযোজনা ‘গণশা রে’ নিয়ে। চলতি বছরের অগাস্ট মাসে শান্তিনিকেতনের কাছে তেপান্তর নাট্যগ্রামে বাংলা নাটক ডট কমের দশদিনের আবাসিক কর্মশালায় এই নাটকের নির্মাণের প্রথম পর্যায় শুরু হয়। স্বপ্নময় চক্রবর্তীর গল্প অবলম্বনে তমোজিৎ রায় বাঁধেন এই পালা। উত্তরবঙ্গের লোকজ সংস্কৃতিকে ছুঁয়ে, রাজবংশী ভাষার চলনে নির্ভর করে এই পালায় দক্ষতার সাথে মিশে গিয়েছে চলতি সময়ের গানের ধুন। তিস্তাপারের মানুষের সুখ দুঃখ ছুঁয়ে এই পালা বলে বর্তমান সমাজের ঘোড়দৌড়ে শিশুদের বিপন্ন শৈশবের কথা। মনুষত্ব বিসর্জন দিয়ে, বিপণনের রাজনীতির সুবিধাবাদী সহজপথের অন্ধকারের দিকে আলোকপাত করে এই পালা হয়ে উঠেছে আমাদের নিত্যদিনের চেনা অথচ দেখেও না দেখার আধুনিক অভ্যাসের আখ্যান। এখানেই এই পালা দর্শককে বিশেষ ভাবে মনোযোগী হতে বাধ্য করে।
নাটক শুরু হয় মঞ্চে উপবিষ্ট অভিনেতাদের গণেশ বন্দনা দিয়ে…এই বন্দনাই বেঁধে দেয় নাটকের সুরটি…গণেশা নামের ক্যাবলা ছেলেটিকে নিয়ে তার বাবা মায়ের চিন্তার অবসান ঘটায় গ্রামেরই ছেলে মদনা। মদনা ‘মিরাক্কেল প্রাইভেট লিমিটেডের দালাল’। প্রলোভন বড় বিষম বস্তু, সে ফাঁদে কত কেউকেটা জেনে শুনে পা বাড়ায় তো ‘দিন আনা দিন খাওয়া’ মহাদেব চাষী ও তাঁর বউ পার্বতী কোন ছাড়। মদনের দেখানো স্বপ্নে মশগুল হয়ে ভালোমন্দের দোলাচলের দড়ি টানাটানি শেষে জয় হয় কোম্পানির মুনাফা লাভের এগ্রিমেন্টের। কোম্পানির গোপন কক্ষে ক্যাবলা গণশার নাক কান অতিকায় হয়ে ওঠে। গণশা হয়ে যায় ভগবান গণেশ।
আর এই অতিমানবীয় রূপ নিয়েই শুরু হয় খেলা। গণশার বাবা মা ও দালাল মদন সকলেই মেতে ওঠে সেই খেলায়। কাঁচা পয়সা রাতারাতি বদলে দেয় স্টেটাস। কিন্তু গণশার মন যে পরে থাকে তিস্তার প্রান্তরে…গাছগাছালি, পাখপাখালির মাঝে…আকাশের ঘুড়ির মত বন্ধুদের সাথে তার প্রাণটাও উড়তে চায়। যদিও তখন তার সে পথে ফেরার রাস্তা বন্ধ। বিজ্ঞাপনের বাহারে তাঁর থানে মানুষ মানত করে বাজা মেয়ের কোল আলো করে সন্তানের আকাঙ্খায় কিম্বা সাপেকাটা রোগীর বাঁচার আশায়। আসলে যে বিশ্বাস অন্ধ, সে বিশ্বাসের অন্ধতায় বুদ হয়ে থাকে মানুষ। এই গণহিস্টিরিয়ায় মান আর হুশ দুইই লোপ পায়। এ তো আবহমানকালের নিয়ম। সেই নিয়মে উধার কা মাল ইধার আর ইধার কা মাক উধার হয়ে চলে। সেই নিয়মেই দুয়ারে এসে নতজানু হয় দলবদল করা পলিটিক্যাল পার্টির নেতা। গণেশের জনপ্রিয়তা তাদের ভোট ব্যাঙ্কের সহায় হবে সেই আশায় যখন প্রচার শুরু হয় ঠিক তখনই গণেশ মুখ ফিরিয়ে নেয়। নাটকে মৃত্যু হয় তার। শুরু হয় নতুন খেলা। মৃত্যু নিয়ে ব্যবসা। কিন্তু এই মৃত্যু কি বার্তা দেয় আমাদের ? সেই উত্তরটা দর্শক নিজের মত করে ভাববেন। তবে নাটকের চূড়ান্ত পরিণতিতে শেষ দৃশ্যে আমরা গণশাকে দেখি বন্ধুর সাথে প্রকৃতির কাছে ফিরে গেছে তাঁর শৈশবের ডানা মেলে।ঠিক তখনই আমাদেরও মনটা কি এই জটিল খেলার থেকে ছুটি চায় ?
গণশারূপী অন্বয় সাহা আগাগোড়া সাবলীল অভিনয়ের মধ্য দিয়ে চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। বিশেষত ঘোড়দৌড়ের দৃশ্যে তালবাদ্যের সাথে অন্বয়ের ছন্দময় চলনে যে ব্যঞ্জনা তৈরি হয় তার উল্লেখ করতেই হয়। গণশার বন্ধু চরিত্রে অহন রায় খুবই ছটফটে ও মজাদার।মহাদেব চাষি চরিত্রে নীলাঞ্জন গুহ আলাদা করে প্রশংসার দাবিদার। চরিত্র অনুযায়ী নীলাঞ্জন দারিদ্র্য ও লোভের অপূর্ব সংমিশ্রণ ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর অভিব্যক্তিতে। পার্বতী চরিত্রে সুতপা সেনগুপ্ত সুন্দর অভিনয় করেছেন।নিম্নবিত্ত পরিবারের না পাওয়ার আকাঙ্খা ও হঠাৎ পেয়ে যাওয়ার ধাক্কায় স্বাভাবিক চারিত্রিক পরিবর্তনের বদল তিনি দক্ষতার সাথে আলাদা করতে সফল হয়েছেন। মহাদেব ও পার্বতীর দেবতার রূপ ধরে আচমকাই মঞ্চে আগমনের মূহুর্তটি নিঃসন্দেহে দর্শকেরা অনেকদিন মনে রাখবেন।
দালাল মদনের চরিত্র চিত্রণ খুবই প্রশংসার দাবি রাখে,অপূর্ব সাহা তার অভিনয়ের আশ্চর্য মুন্সিয়ানায় একই সাথে ধান্দাবাজ অথবা সার্কাসের রিং মাস্টারের মত নিয়ন্ত্রণ করেছেন নাটকের সমস্ত চরিত্রগুলিকে।
রাজনৈতিক দলের নেত্রী চরিত্রে অল্প সময়ের জন্য পৌলামী মুখার্জী চরিত্রটিকে খুবই বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। তাঁর বিশেষ ম্যানারিজমে প্রত্যক্ষ করে দর্শকরা আমোদিত হয়েছেন নিঃসন্দেহে। তার চাইতেও বড় কথা পরিচালক এই অংশে খুব সচেতন ভাবেই রাজনৈতিক নেতার সরকারি ক্ষমতা অপব্যবহারকে ব্যঙ্গ করতে স্বার্থক।
এই নাটকটিকে আগাগোড়া এগিয়ে নিয়ে যায় কোরাসের যৌথ কথোপকথন…যা পালাটির অন্যতম আকর্ষণও বটে। কোরাস অভিনয়ের সাথে সাথে নাচে গানে কি পট পরিবর্তনে পালাটিকে আকর্ষণীয় করে রেখেছেন লুনা সাহা,সৌরদীপা রায় ও পৌলমী মুখার্জী। গিদালের দলে অনিন্দিতা রায়, সৌভিক ধর,শান্তনু রায় ও তমোজিত রায় যোগ্য সঙ্গত করেছেন। বিশেষ ভাবে অনিন্দিতার কথা বলতেই হয়। উত্তরবঙ্গের লোকসঙ্গীতের অন্যতম পরিচিত নাম অনিন্দিতা এই নাটকের গানগুলিকে প্রাণ দিয়েছেন। সৌভিকের ও শান্তনুর হারমোনিয়াম ও ঢোল পালাটিকে মিউজিক্যালি আকর্ষনীয় করেছে।
নাটকটিতে ফ্লাড লাইটের ব্যবহার খুব সচেতন ভাবেই করা হয়েছে। তবে কিছু বিশেষ মুহূর্তের আলো মঞ্চে যথাযথ মায়া তৈরি করতে সক্ষম। যদিও কিছু কিছু জায়গায় আলোর ব্যবহার নিয়ে পরিচালক ভাবতে পারেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক সভা ছেড়ে গণশার মন যখন বন্ধুর কাছে ছুটে যাচ্ছে সেই সময়ের আলোয় কিছু বদল দাবি করে। আলোক প্রক্ষেপণে আশিস দে দায়িত্বের সাথে যথাযথ ভূমিকা পালন করেছেন।
শুধুমাত্র আক্ষরিক নয় সার্বিক অর্থেই পালাকার/নির্দেশক তমোজিত রায় যত্ন করে নির্মাণ করেছেন সম্পূর্ন প্রযোজনাটি।
অবশ্যই জলপাইগুড়ি কলাকুশলীর শিল্পীদের সকলের যৌথ প্রয়াসে ২৮শে নভেম্বর’২০২১ জলপাইগুড়ি রবীন্দ্রভবনের পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের মনোরঞ্জনের পাশাপাশি কিছু বাস্তব সত্যের মুখোমুখি দাড় করিয়েছে।শিরদাঁড়া টান করে আসুন আমরা সত্যের পথে চলি। এটাই সময়ের দাবি। বলে জানালেন নাট্যকার তমজিৎ রায়।

