ইতিহাস বহন করে চলেছে এই হল। ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের নামানুসারে এ ভবনটি টাউন হল হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় ও গভর্নর জেনারেল জর্জ কার্জন ঢাকায় কার্জন হলের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। ঐতিহাসিক ভবনটি এখন পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃত। এটি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও জীব বিজ্ঞান অনুষদের কিছু শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার হল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হওয়ার পর প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তোলার জন্য রমনা এলাকার যেসব ইমারতের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় কার্জন হল তার মধ্যে অন্যতম।
কার্জন হল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ভবন, যা পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃত। ১১২ বছর ধরে ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য আর কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কার্জন হল।
বর্তমানে কার্জন হল ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাজে ব্যবহৃত হলেও এটি ছাত্র-ছাত্রীসহ দেশ-বিদেশের পর্যটকদেরও বিনোদনের অন্যতম কেন্দ্রও বটে। প্রতিদিন বিকালে এখানে জমে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার ও দেশ-বিদেশের বিনোদনপ্রিয় হাজারো মানুষের আড্ডা।
ফেব্রুয়ারি ১৪, ১৯০৪ সালে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় ও গভর্ণর জেনারেল – জর্জ কার্জন এর ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন করেন। এর পরের বছরই বাংলাকে বিভক্ত করা হয় এবং ঢাকা হয় নতুন প্রদেশ পূর্ববঙ্গ ও আসামের রাজধানী। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে এটি ঢাকা কলেজ ভবন হিসেবে ব্যবহূত হতে থাকে। পরে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে এ ভবন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের অংশ হিসেবে ব্যবহূত হতে শুরু করে এবং এখনও এভাবেই চলছে। অত্যন্ত যত্নসহকারে গড়ে তোলা প্রশস্ত বাগানে নির্মিত ইটের এ দ্বিতল ভবনে রয়েছে একটি বিশাল কেন্দ্রীয় হল। সে সাথে পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পার্শ্বে রয়েছে সংযোজিত কাঠামো যা অসংখ্য কক্ষ সমৃদ্ধ এবং চারপাশ দিয়ে বারান্দা ঘেরা।
ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য হিসেবে বিবেচিত এ ভবনটিতে সংযোজিত হয়েছে ইউরোপ ও মুগল স্থাপত্য রীতির দৃষ্টিনন্দন সংমিশ্রণ।স্থাপত্যবিদরা জানান, সম্রাট আকবর নির্মিত ফতেহ্পুর সিক্রির দুর্গের সঙ্গে এ ভবনের স্থাপত্য নকশার মিল রয়েছে।লাল রঙ ব্যবহূত হয়েছে মুগল আমলের লাল বেলেপাথরের পরিবর্তে; আর অলংকৃত বন্ধনী, গভীর ছাঁইচ (eaves), গম্বুজ বিশিষ্ট প্যাভিলিয়ন, বিশেষকরে মাঝের অংশগুলি ১৫৭০ থেকে ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সম্রাট আকবরের রাজধানী প্রাসাদ সমৃদ্ধ নগরদুর্গ ফতেহপুর সিক্রির ছোট কিন্তু সুপরিচিত দীউয়ান-ই-খাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। উভয় নগরই নতুন রাজধানী ছিল। শুধু তাই নয়, ইচ্ছাকৃতভাবে ফতেহপুর সিক্রি রীতি গ্রহণের পেছনে কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, ব্রিটিশরা আকবরকেই সবচেয়ে বিজ্ঞ ও সর্বাধিক সহিষ্ণু মুগল সম্রাট হিসেবে গণ্য করত এবং তারা দেখাতে চাইত যে ভারতে তাদেরও ভূমিকা অনুরূপ।
ভাষা আন্দোলন এর ইতিহাসে কার্জন হল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ১৯৪৮ সালে এখানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ তদানীন্তন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এতদসংক্রান্ত জিন্নাহর ঘোষণার প্রতি প্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিল। বর্তমানে কার্জন হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিজ্ঞান অনুষদের অধিকাংশ বিভাগ এ ভবনটিতে। হাইকোর্ট ভবনের দক্ষিণ দিকে এই ঐতিহ্যবাহী কার্জন হল ভবনটি অবস্থিত। ভবনটির পশ্চিমে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ এবং দক্ষিণে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল। কারুকার্যখচিত বিশাল এ ভবনে রয়েছে একটি বিশাল কেন্দ্রীয় হল।

