সাধ্যের সীমারেখা পেরিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সাধ পূরণ!

সাধ্যের সীমারেখা পেরিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সাধ পূরণ! ঢাকাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকশিক্ষিকাদের নানান কর্মকাণ্ড

মলয় দে নদীয়া :- জাতির মেরুদন্ড শিক্ষককূল। তাঁদের হাতেই তৈরি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল,পুলিশ, এমন কি শিক্ষকও। অর্থাৎ সমাজের সকল স্তরের প্রতিনিধি। সমাজ গড়ার কারিগর তো তাঁরাই! তাইতো, অন্যান্য পেশার থেকে শিক্ষকতা সম্মানজনক, বিশ্বাস এবং ভরসার। যেকোনো কারণেই হোক আজ, অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নের মুখে এই পেশা। সংবাদ মাধ্যমে প্রায়শই উঠে আসে , আন্তরিকতা একাগ্রতা বিহীন শুধুই বেতনভোগী ত্যাগবিহীন
নানান ঘটনা, ব্যভিচারের চিত্রও লক্ষ্য করা যায়। মেলানো যায় না সেকাল এবং একালের শিক্ষকদের ব্যাক্তিত্ব। অন্যদিকে একইভাবে তাদের প্রতি সম্মান জানানোর বদলে কটুক্তি আর সমালোচনা। যদিও এ প্রসঙ্গে অনেকেই মনে করেন, শিক্ষকের হাতে বেত থাকলে, তবেই নিয়ন্ত্রণে থাকে সমাজ। কেউ কেউ আবার, ভগিনী নিবেদিতা, বিদ্যাসাগর, শ্রীচৈতন্যদেব, স্বামীজী,রামমোহনের বহু সমাজ গড়ার কারিগর কে বেতবিহীন ভাবেই সমাজ নিয়ন্ত্রণের করেছিলেন অতীতে, সেই দৃষ্টান্তই তুলে ধরেন।
শুধুই চোখের সামনে ভাসতে থাকা অন্ধকারের ছবি নয়, সংখ্যায় অত্যন্ত কম হলেও এমনও কিছু উদাহরণ দেখা যায় যার ফলে আবারো নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখা যায়, মানবিকতার প্রশ্ন তুলে বিদ্ধ করার যাদের বোধ ফিরছে না তারাও হয়তো অনুপ্রাণিত হবেন নতুন করে। আজ গুরু পূর্ণিমায় এমনই এক দৃষ্টান্ত তুলে ধরব আপনাদের সামনে।
শান্তিপুর শহরের দুই নম্বর ওয়ার্ডের ঢাকা-পাড়া প্রাইমারি স্কুলে ছাত্র- ছাত্রীরা পঠনপাঠন শুরু হওয়ার আগে সুসজ্জিত ভাবে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করে আর পাঁচটা সাধারণ বিদ্যালয়ের মতো জাতীয় সংগীত গেয়ে থাকে, তবে আশ্চর্যের বিষয় “বন্দেমাতরম” এবং “মঙ্গল দীপ জ্বেলে” গানদুটিও প্রার্থনা আকারে গেয়ে থাকে। শুধু কি ছাত্রছাত্রীরা! প্রেয়ার লাইনে না দাঁড়ালেও, অভিভাবকরাও বিনত মস্তকে গুনগুনিয়ে গেয়ে থাকে ছাত্রছাত্রীদেরই সাথে। তাদের মতে চারিদিকে ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয় গুলিতে ভিড় জমলেও এই প্রাথমিক বিদ্যালয় তারা ছেড়ে যেতে রাজি নন। করোনা পরিস্থিতি হোক বা তার পরবর্তী গ্রীষ্মকালীন ছুটি, বিদ্যালয়ের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিয়মিত, পড়াশোনা চলতো। সরকারি প্রশ্নপত্রর মতোই, বিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রশ্নপত্র দেওয়া এবং তার উত্তরপত্র জমা নেওয়ার কাজ চলতো সপ্তাহে দুদিন। বিদ্যালয়েরই এক শিক্ষক, তার পূর্বের বিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে, বার্থ সার্টিফিকেট, আধার কার্ড, বিদ্যালয়ের শিক্ষা পোর্টালের ছাত্রছাত্রীর বয়স, নামের বানান, ঠিকানা, অভিভাবকদের নাম সংশোধনের অভিভাবকদের নিয়ে মাঝে মধ্যেই ক্লাস করে থাকেন। কখনো কখনো প্রধান শিক্ষককে নিয়ে, বিভিন্ন পৌরসভায়, এমনকি হাসপাতালে পর্যন্ত পৌঁছেগেছেন ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে।
সরকারী যা অনুদান মিলেছে তার থেকেও, এক কদম এগিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ নিজ দায়িত্বে বিল্ডার্সের দোকান থেকে ধার করেছেন পরের অনুদানের প্রতীক্ষায়। ঝাঁ চকচকে শৌচাগার, প্রার্থনার হলঘর সহ বেশ কিছু গুরুদায়িত্ব নিয়েছেন নিজেদের কাঁধে তুলে।
সাধ্য যেমনই হোক সাধ পূরণ করতে, জুরি মেলা ভার এই বিদ্যালয়ের। দেওয়ালে প্লাস্টার নেই, বের হওয়া ক্লাসরুমে ছাত্রছাত্রীদের অসুবিধার কথা মাথায় রেখে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে তিনটি করে ফ্যান ঘুরছে বনবন করে, এমনকি প্রার্থনা সঙ্গীতের সময়ও টেবিল ফ্যান নিয়ে এসে হাওয়া দেওয়ার ব্যবস্থা করেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। শুনলে আশ্চর্য হয়ে যাবেন এই ইলেকট্রিক বিল এর টাকাও কিন্তু
শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দিতে হয় ব্যক্তিগতভাবে।
অভিভাবকরাও মানছেন, সরকারি বিদ্যালয়ে গানবাজনা, বাদ্যযন্ত্র শেখার ব্যবস্থা নেই ঠিকই তবে এভাবে গান করার ফলে তাদের ছেলে মেয়েদের মধ্যে সংষ্কৃতিপ্রবণ হওয়ার ঝোঁক বেড়েছে অনেকটাই। গান-বাজনায় পারদর্শী না হলেও, সপ্তাহে একদিন শিক্ষক শিক্ষিকারা
ছাত্র ছাত্রীদের অনুশীলন করান, পড়াশোনার পরেই।