মাত্র কয়েকজন চায়ের দোকানদার মিলেই, জমজমাট করে ফেললো এক সময়ে শান্তিপুরের নির্জন বাইপাস মোড়

মাত্র কয়েকজন চায়ের দোকানদার মিলেই, জমজমাট করে ফেললো এক সময়ে শান্তিপুরের নির্জন বাইপাস মোড়

মলয় দে নদীয়া :-
বিশ্বে সর্বোচ্চ চা রপ্তানিকারক দেশ চীন হলেও ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম চা উৎপাদক দেশ তবে এর ৭০ শতাংশের বেশি চা ভারতেই পান করা হয়। গ্রিকদেবী থিয়ার নামানুসারে এরূপ নামকরণ করা হয়েছিলো চীনে, ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘টি’-এর উচ্চারণ ছিল ‘চি’। পরবর্তীতে সেটি হয়ে যায় ‘চা’। সিলেটে প্রথম চা গাছের দেখা পেয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইংরেজরা ভারতবর্ষে চায়ের আবির্ভাব ঘটায় ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য। সে সময় রাস্তার পাশে অনেক ছোট ছোট দোকান করে বিনামূল্যে চা বিতরণ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো, ইংরেজরা বিতাড়িত হলেও, সেই চা আজ প্রতি ঘরে ঘরে।
শান্তিপুর শহরেরর সীমান্তবর্তী বাইপাস এখন অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে এরকমটা ছিল না ৮-১০ বছর আগেও। ৪-৫ জন সেখানে দোকান করলেও সন্ধ্যের পর জনশূন্য হয়ে থাকতো। দিনের বেলাও খুব বেচাকেনা এমন নয়, কখনো সখনো বাস লরি বিকল হলে অথবা একান্ত প্রয়োজন হলে তবেই দাঁড়াতো সেখানে।
এলাকা জমজমাট করতে, ওই কয়েকজন চায়ের দোকান সিদ্ধান্ত নিলেন, চা বেঁচে লাভের প্রয়োজন নেই, দোকানে ক্রেতা দরকার আগে। এরপর দোকানদাররা নিজ নিজ কৌশলে, বাড়াতে থাকলেন চায়ের গুণগত মান। কেউ দুধ ফুটিয়ে ঘন করেন, কেউবা এক বিশেষ কোম্পানির প্যাকেটজাত দুধ চিনি ছাড়াই সুস্বাদু করে তুললেন, কেউ আবার গুঁড়ো দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে বিভিন্ন চায়ের পাতার মিশ্রণে ক্রেতাদের মন ভরাতে থাকলেন। আর এভাবেই বিগত তিন চার বছরের মধ্যে জমে উঠলো বাইপাসের চা। সারা বছর তাঁত কাপড় কিনতে আসা ক্রেতারা এই বাইপাসেই , গাট বেঁধে নিয়ে যান কাপড়, সেই সাথে চাও। কুচবিহার থেকে আসা পপি মল্লিক উদাহরণ হয়ে দাঁড়ালেন আমাদের কাছে। তিনি ফ্লাক্সে করে চা নিয়ে যান প্রতিবারই।
শান্তিপুর গোপালপুর থেকে তিন কিলোমিটার পথ বাইক চালিয়ে রানা গোল্লারদের মতন অনেকেই দূর দূরান্ত থেকে বিকাল হলেই পৌঁছান চা খেতে।
একসময় নির্জন জায়গায় চা খেতে দ্বিধাবোধ করেন না গৃহবধূ থেকে পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরাও।
দূরপাল্লার বাস কলকাতা থেকে ছেড়ে তিন ঘণ্টার পথে চা খেতে দাঁড়ান দু জায়গায়। তার মধ্যে শান্তিপুর অবশ্যই জানালেন কলকাতা মালদা লাক্সারি বাসের কন্ডাক্টর দীপঙ্কর সাহা।
এমনকি অফিস আদালতের কাজে যাওয়ার পথে ব্রেকে পা পড়ে যায়, শান্তিপুরের উপর দিয়ে গেলেই , ক্যামেরার সামনে চাকুরীর জন্য আসতে না পারলেও অনেকেই জানালেন সে কথা।
চাকদা কৃষ্ণনগরের মতো দূরবর্তী এলাকা থেকে শুধুমাত্র চায়ের টানে শান্তিপুরে পৌঁছানোর কথা আজগুবি মনে হলেও ঘন্টা দুয়েকের প্রতীক্ষায় জানতে পারবেন এইরকম নানান ব্যতিক্রমী ঘটনা। তবে চায়ের দাম, একেবারে স্বাভাবিক কাগজের কাপে ৫ টাকা থেকে শুরু , মাটির ভাঁড়ে১০ টাকা, স্পেশাল কুড়ি টাকা। শুধু সন্ধ্যা নয়, দোকানদাররা জানালেন ভোর পাঁচটা থেকে, এক এক দিন প্রায় বারোশো কাপ চা বিক্রি হয় প্রতিটা দোকানে। বিপুল পরিমাণে বিক্রির জন্যই, উনুনে কেটলির উপর দুধ ফুটতেই থাকে সবসময়। তাতে একদিকে যেমন খরচ পুষিয়ে যায় অন্যদিকে গুণগত মান আরো ভালো হয়।
চায়ে পে চর্চা হোক বা কর্মীদের নিজের হাতে চা করে খাওয়ানোর দলে বড় মাপের নেতাদেরও মাঝেমধ্যেই দেখা যায় এই বাইপাসে কিছুটা সময় কাটাতে।
ভ্যানচালক অথবা কৃষিমাঠের শ্রমিক তারা জানালেন, দুটো বিস্কুট দিয়ে ঘন দশ টাকার চা খেলে সকালের টিফিন হয়ে যায়। এরপর দুপুরে রুটি পাউরুটি এক গ্লাস চা, যেমন খরচ কম তেমন পেটও ভরা থাকে অনেকক্ষণ।