মলয় দে, নদীয়া:- ভারতবর্ষের তিন পন্ডিতের এক পন্ডিত নদীয়ার শান্তিপুরের পন্ডিত লক্ষ্মীকান্ত মৈত্র জন্মগ্রহন করেন ১৮৯৫ সালের ২৩শে জুলাই ৷ এবছর ১২৯ বছর পূর্ন হলো ৷ অত্যন্ত মেধাবী লক্ষ্মীকান্ত মৈত্র এম এ, বি. এল., কাব্য সাংখ্য তীর্থ ডিগ্রী লাভ করেন কোলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে ৷ ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আইন পেশা ছেড়ে দিয়ে শান্তিপুরে পৈতৃক বাড়িতেই ক্ষুদ্র শিল্পের প্রসারে “শিল্পাশ্রম” তৈরী করেন ৷ ১৯৩৪ সালে কংগ্রেস সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার দিকে অগ্রসর হলে তীব্র প্রতিবাদ করে আরেক পন্ডিত মদন মোহন মালব্য কংগ্রেসের মধ্যে থেকেই উপদল “জাতীয় কংগ্রেস দল” গঠন করলে পন্ডিত লক্ষ্মীকান্ত মৈত্র তাতে যোগদেন ৷
তিরিশের দশকের শেষ দিক সেটা। কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র। বিশ্বাস একমাত্র সশস্ত্র আন্দোলনের পথেই স্বাধীনতা আনা সম্ভব ভারতবর্ষে। পাশাপাশি ভারতভাগের প্রস্তাব কংগ্রেসের অনেক শীর্ষ নেতৃত্ব মেনে নিলেও, স্পষ্টতই নেতাজির মতবিরোধ ছিল তা নিয়ে। তবে সেদিন কংগ্রেসে থেকেও, নেতাজির এই নতুন ‘পথচলা’-কে সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন তিনি। অকুণ্ঠিতভাবেই জানিয়েছিলেন, তরুণ প্রজন্মও এগিয়ে আসবে তাঁর এই উদ্যোগে। আর সেই সূত্রেই তিনি নেতাজির প্রতিষ্ঠিত নতুন রাজনৈতিক দলের নামকরণ করেছিলেন ফরোয়ার্ড ব্লক।
১৯৩৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস বাংলার প্রেসিডেন্সী ডিভিশন থেকে পন্ডিত মদন মোহন মালব্যের “জাতীয় কংগ্রেস দলের” প্রার্থী হয়ে কংগ্রেস দলের প্রার্থী হেমন্ত সরকারকে পরাজিত করেন ৷ এরপর কেন্দ্রিয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য হন ৷ ১৯৪৬ সালে কোলকাতা কেন্দ্রের উপ নির্বাচনেও জয়লাভ করেন পন্ডিত লক্ষ্মীকান্ত মৈত্র ৷ ১৯৪৮সালে অস্থায়ী পার্লামেন্ট গঠন হলে ড. আম্বেদকরের নেতৃত্বে গঠিত ভারতীয় সংবিধান রচনা কমিটির সদস্য হন ৷ কিন্তু পন্ডিত জওহর লাল নেহরুর চাটুকারিতা না করার জন্যই বাঙালী পন্ডিতকে সেভাবে গূরুত্বই দেওয়া হয় নি ৷ তাই সংসদে তাঁর কোন মূর্তি নেই বলে আক্ষেপ রয়েছে তাঁর ঘনিষ্টদের ৷ আসল পন্ডিতের প্রসারতাকে যে দাবীয়ে রাখা যায় না, তার প্রমান পাওয়া যায় সংসদে দেওয়া তাঁর বক্তৃতামালা থেকে ৷ তাঁর ক্ষুরধার যুক্তির কাছে পন্ডিত নেহরুও অসহায় বোধ করতেন ।
নদীয়ার শান্তিপুরে তার বসত বাড়ি হওয়ার সুবাদে, ব্যাপক উন্নতি সাধন হয়েছিলো। রেল স্টেশন শান্তিপুর কলেজ পুরাণ পরিষদ সহ বেশ কিছু নিদর্শন আজও বিদ্যমান।
তার পুত্র কাশীকান্ত মৈত্র, পরবর্তীতে নাতি ডঃ সুব্রত মৈত্রও তাঁর ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছিলেন। তবে শান্তিপুর কলেজে একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হলেও, শান্তিপুর রেলওয়ে স্টেশনের জমি দাতা হলেও দুঃখের বিষয় আজও তার আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়নি।
আজ আজ শান্তিপুর পুরসভা, শান্তিপুর কলেজ, এবং রেল যাত্রী সমিতির পক্ষ থেকে শান্তিপুর রেলওয়ে স্টেশনে তার একটি প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করা হয়।
সম্প্রতি কয়েক বছর আগে শান্তিপুর মরমীর পক্ষ থেকে তাঁর জীবনশৈলী এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়।
তবে এত বিখ্যাত এবং জাতীয় স্তরের নেতৃত্বের প্রতি সরকারি কোনো আবেগ লক্ষ্য করা যায় না। তবে তাঁর এবং তাঁর পুত্র কাশীকান্ত মৈত্রের স্মৃতি কমিটি কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণিতে সারাদিনব্যাপী রক্তদান এবং স্মৃতি কথা আলোচনার ব্যবস্থা করেন প্রতিবছর। আজ সেই অনুষ্ঠানে, এসেছিলেন নাতি,নাতনি, নাতবৌ, সহ আত্মীয়বর্গ এবং গুণমুগ্ধরা।

