দুই সম্প্রদায় ভুক্ত হওয়ার কারণে দুই মৃতদেহর যাত্রা আলাদা হলেও কর্নিয়ার স্থান এক কুঠুরিতেই

মলয় দে নদীয়া:-
“একশে দেশের মাটিতে পাই- কেউ গরে, কেউ শ্মশানে ঠায় ”
মৃত্যুর পর শেষকৃত্যের অন্তিম যাত্রাপথ ভিন্ন হলেও সেই ধর্মীয় বেড়াজাল হার মানল মানবিকতার কাছে। শেষকৃত্যের জন্য দেহ পৃথক স্থানে নিয়ে যাওয়া হলেও দুই ব্যক্তির কর্নিয়ার ঠাই হলো একই কুঠুরিতে। ঘটনাটি নদীয়ার শান্তিপুরের। ব্রাহ্মণ ও মুসলিম পরিবারের উদ্যোগে মহানুভবতায় দৃষ্টি ফিরে পাবেন চারজন মানুষ।
শান্তিপুর কলেজের প্রাপ্ত অধ্যাপক পরমানন্দ মুখার্জির পুত্র কন্যাদের অসহনীয় দারিদ্র্যের তথ্য ইতিমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত। একসময় সরকারের কাছে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানিয়েছিলেন অধ্যাপক পুত্র কন্যারা। সেই পরিবারের মেজ সন্তান দেবাশীষ মুখার্জি গতকাল প্রয়াত হয়েছেন। অনেকদিন আগে তিনি একটি বেসরকারি ওষুধ সংস্থায় কেমিস্টের কাজ করতেন। এত দারিদ্রতার মধ্যে থেকেও সমাজসেবা ও মানবিকতায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন অধ্যাপক পুত্র দেবাশীষ। শুধু তিনি নয় তার ভাই প্রয়াত হওয়ার পর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মরণোত্তর দেহ দান করেছেন। এই প্রসঙ্গে দেবাশীষ বাবুর দিদি নমিতা মুখার্জি বলেন ” আমরা অনেকদিন আগেই মরণত্তর দেহদান ও চক্ষু দানের অঙ্গীকার করেছিলাম। আমার মৃত্যু পরেও চিকিৎসা গবেষণার উন্নয়নের জন্য দেহদান করবো”।
অন্য একটি ঘটনায়, শান্তিপুর ডাকঘর এলাকার ৭৬ বছর বয়সী আমিনুল ইসলাম গতকাল প্রয়াত হন । আর অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী পরিবারের আহ্বানে শান্তিপুর মরমের পক্ষ থেকে কর্নিয়া সংগ্রহ করতে আসেন সদস্যরা।
তার সম্প্রদায় থেকে এ ধরনের দৃঢ় সিদ্ধান্ত শান্তিপুরে খুব একটা চোখে পড়ে না। তার স্ত্রী আমিরা খাতুন বলেন ” অত্যন্ত বড় মনের মানুষ ছিলেন সেজন্য তিনি চেয়েছিলেন তার মৃত্যুর পরেও তিনি কারোর প্রয়োজনে লাগুন তাই এই মরণোত্তর চক্ষুদান”।
ছেলে সৈকত ইসলাম বলেন, সমস্ত ধর্মীয় রীতিনীতি মানা হচ্ছে। তার থেকেও বড় বিষয় মানবিকতা যেটা এই পরিবারের বাবার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতারা পথ দেখিয়েছিলেন চক্ষু দান করে। আমি গর্বিত আমার পরিবারের এই সিদ্ধান্তের জন্য । মুসলিম ধর্মালম্বী সকলকে, এগিয়ে আসার অনুরোধ জানাবো মানবতার জন্য। নিজে ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য।
মেয়ে বলেন, প্রত্যেক ধর্মেরই উদ্দেশ্য মহৎ এবং মানব সেবা। সেই কাজে ব্রতী কখনোই ভুল নয়।
মৃত্যুর পর এবং দীর্ঘদিন ধরে ও চক্ষুদান সম্পর্কে জনসচেতন তা ও প্রচারের কাজ করে যাচ্ছে শান্তিপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মরমী। ২০১৪ সালের মে মাসে শান্তিপুর সুত্রাগড় অঞ্চলের সর্বমঙ্গলা দে র মৃত্যুর পর তার দুটি কর্ণিয়া সংগ্রহের মধ্যে দিয়ে প্রথম চক্ষু সংগ্রহ শুরু করে মরমী। আজ সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে, ২৩৪ জনে, অর্থাৎ কর্নিয়ার হিসাবে ৪৬৫। এর মধ্যে তিনজন ব্যক্তির একটি করে করনীয় সংগৃহীত হয়েছে মৃতদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে। যদিও তার আগেও মরমি সহযোগী হিসেবে কাজ করতো কলকাতা দিশা আই কেয়ার সেন্টার ও প্রভা আই কেয়ার সেন্টারে তত্ত্বাবধানে চক্ষু সংগ্রহের কাজ করতো মরমী। পরবর্তীতে অজয় দে মেমোরিয়াল আই কানেকশন সেন্টার হিসাবে মরমীর শাখা সংগঠন হিসেবে কাজ শুরু করে গত 2022 সালের জুন মাস থেকে। সেখানেও বিশেষভাবে সক্ষম, শান্তিপুরের বিখ্যাত চিত্রকর শিবতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুটি কর্নিয়া সংগ্রহের মাধ্যমে পথ চলা শুরু এককভাবে। সেই সংখ্যাটাও আজ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ জনে, কর্ণিয়ার হিসেবে ১৩৬টি।
এ প্রসঙ্গে , কর্নিয়া সংগ্রহকারী রঘুনাথ কর্মকার জানান, একসময় রক্তদানের ব্যাপারেও নানান ধর্মীয় এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ছিলো, যা অনেকটাই সহজ হয়েছে এখন। কর্নিয়া সংগ্রহের বিষয়ে রাজ্যের বেশ কিছু জায়গায় কাজ শুরু হলেও শান্তিপুর তার মধ্যে অন্যতম।