লভ্যাংশ বড় কথা নয়! নেট দুনিয়াকে কাজে লাগিয়ে হস্তশিল্পে কদর দেওয়া ক্রেতাদের সাথে হারিয়ে যাওয়া হস্ত চালিত তাঁত শিল্পীদের সমন্বয়কারী এক গৃহবধূ

মলয় দে নদীয়া :- একসময় নদীয়ার শান্তিপুরের প্রত্যেক গ্রাম এবং শহর এলাকায় মানুষের ঘুম ভাঙতো হস্ত চালিত তাঁতের খটখটানিতে। প্রতিটি বাড়িই প্রায় কারখানাতে রূপান্তরিত হয়েছিলো। একদিকে বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতিতে অল্প দামে হাতের নাগালে তাঁত শাড়ির বিপুল চাহিদা অন্যদিকে তার সাথে সস্তায় বাজিমাত করা কিছু ধুরন্ধর ব্যবসায়ীর নকল সুতোর আমদানি, ড্রাম হাটা থেকে শানা বোয়া এমনকি সুতোর রঙে পর্যন্ত ভেজাল । ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে সমগ্র হস্ত চালিত তাঁত শিল্প।
হস্তশিল্পের সুদক্ষ কারিগর হওয়া সত্ত্বেও দেশে-বিদেশে হোটেল রেস্তোরা, নির্মাণ কর্মীর কাজ বেছে নিয়ে পরিযায়ী শ্রমিক হতে বাধ্য হয়েছেন অভাবের সংসার সামলাতে।
প্রথমে জ্যাকার্ড, পরবর্তীতে পাওয়ারলুম, তার পরে উন্নত রেপিয়ার, বর্তমানে কম্পিউটারাইজ হাওয়াই মেশিনে চলছে উৎপাদন। এক মেশিনেই করছে ৩০-৪০ জনের কাজ।
কিন্তু, হাতের সেই বুননের আবেগ, নিখুঁত বুটি সেসব এখন ইতিহাস। তবে দরিদ্র এবং নিম্ন মধ্যবিত্তের কাছে সস্তার শাড়ি উৎপাদন প্রয়োজনীয় হলেও। কিছু বিত্তবান এবং শিল্পের মর্যাদা দেওয়া মানুষজন আজও আছেন দেশে-বিদেশে। যেখানে তারা উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়েও মেলাতে পারছেন না দক্ষ শ্রমিক অভিজ্ঞতা আন্তরিকতার বুনন।
রানাঘাটের মান্ডবী চক্রবর্তী, পুঁথি বিদ্যায় গোল্ড মেডেলিস্ট, রবীন্দ্রভারতীতে সংস্কৃতে পিএইচডি পাঠরতা । ছবি আঁকা ফেব্রিক ক্র্যাফ্টের ওপর বিভিন্ন কাজকর্ম করতেন শখে। 2017 সালে বিবাহ সূত্রে শান্তিপুরের সুত্রাগর এলাকায় আসেন স্বামী অভিক দত্তের বাড়িতে। বাপের বাড়ি হোক কিংবা শশুর বাড়ি এমনকি কোন নিকট আত্মীয়র বাড়িতেও তাঁতের কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে শিল্পের পৃষ্ঠপোষক হওয়ার জন্য এবং বাড়ির কাছে বিখ্যাত তাঁতের হাট হওয়ার সুবাদে মাঝেমধ্যেই সেখানে গিয়ে নিত্যনতুন ডিজাইন, তাঁতিদের সুবিধা ও অসুবিধার কথা শুনতেন তিনি। স্বামী চাকরির সুবাদে সারাদিন থাকেন শান্তিপুরের বাইরে, ছোট্ট একরত্তি মেয়েকে নিয়েই, পৌঁছে যেতেন তাঁতিদের বাড়ি বাড়ি। নিজের আঁকা ছবি শাড়িতে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকেন তাদের মধ্যে পারদর্শী দুই একজন তাঁত শিল্পীকে দিয়ে। instagram, টুইটার সহ নানান সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করিয়ে শিল্পের পৃষ্ঠপোষক ক্রেতা র দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে শুরু করেন। একের পর এক হস্ত চালিত তাঁত শ্রমিকের হাতের কাজের মেধা অন্বেষণ এর মধ্য দিয়ে আজ তার ২২ জন সুদক্ষ তাঁতি। এমনকি সারাদিনে ৫০০ থেকে হাজার টাকা উপার্জনের মধ্যে দিয়ে ,মজুরির দিক থেকে টেক্কা দিয়েছেন, উন্নত মেশিনে যন্ত্র চালিত মেশিনে কাজ করা তাঁতিদের কেও। আসলে হবে না কেনো, শাড়ির মূল্য ৩-৪ হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত। এখনো পর্যন্ত একটি শাড়ি পিছু সর্বাধিক মজুরি আশি হাজার টাকা পর্যন্ত পেয়েছেন তাঁতি অবশ্য সাত-আট মাস সময় লেগেছে।

শুধু তাই নয় করোনা পরিস্থিতির মধ্যে যখন, বড় বড় মহাজনরা কাজ দেওয়া বন্ধ করেছিলেন, মান্ডবী দেবী, তার তাঁতিদের মজুরি দিয়ে গেছেন একইভাবে। শান্তিপুর ছাড়িয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালিত তাঁত শিল্পীরা বড় বড় মহাজন ছেড়ে নতুন দিশা দেখেছেন এই গৃহবধূর যোগাযোগে। শাড়ির উপর বিভিন্ন ধরনের নকশা লতাপাতা ফুল এই চিন্তা ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে তিনি বিভিন্ন পোর্ট্রেট এর কাজ শুরু করেন। সমস্ত শাড়ির মধ্যে তুলে ধরেন, শ্রীকৃষ্ণের ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত সমস্ত লীলা, শারদীয়া আগমনের বিভিন্ন চিত্র, গুপী গাইন বাঘা বাইন, হীরক রাজার দেশের বেশ কিছু সিনেমার উদ্ধৃতি সহ অসাধারণ হাতের কাজ,
হাদাভোদা ,নন্টে ফন্টে, অরণ্যদেব,টিন টিনের মতো কমিক্সের বেশ কিছু আকর্ষণীয় সিরিজ,
রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন পর্যায়ের গান, বিখ্যাত গল্প উপন্যাসের বহুল প্রচলিত অংশ , সুকুমার রায়ের আবোল তাবোল, ভ্যানগর্গের স্টারি নাইট আরো কত কি! সুতোর সূক্ষ্ম বুননে, তবে হ্যাঁ প্রথমে তিনি নিজে আঁকেন ছবি, এরপর সুদক্ষ্য তাঁতীর সাথে আলোচনার ভিত্তিতে, তা রূপ নেয় বারো হাত শাড়িতে। তবে এই শিল্পকর্ম এখন শুধু শাড়িতেই সীমাবদ্ধ নেই, কুর্তি, ধুতি, ড্রেস মেটেরিয়ালস , স্কার্ফ,ওড়না, ঘর সাজানোয় ব্যবহৃত বিছানার চাদর পর্দার কাপড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সৌখিন ঢাকনায় পর্যন্ত বিস্তারিত হয়েছে। মটকা, রেশম, কটন ,তসর ,স্টান সিল্ক ,লিলেন এ ধরনের নানান উপকরণ পার্শ্ববর্তী ফুলিয়াতে পেলেও, গুণগত মান বজায় রাখতে মাঝেমধ্যে তা অন্যান্য রাজ্য থেকেও আনেন।
তবে তার উৎপাদিত পণ্যের কোনো আউটলেট বা দোকান নেই। বিভিন্ন ফ্যাশন ডিজাইনা…