সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির শেষেও আদিবাসীদের নিয়মিত নাচ গানের অনুশীলন করম পূজার প্রতীক্ষায়! পঞ্চায়েতের সহযোগিতায় খুশি ওঁরা

 

মলয় দে নদীয়া :- আদিবাসীদের কাছে টুসু ভাদুর মতো অত্যন্ত জনপ্রিয় করম পুজো। ভাদ্র মাসে জাওয়া পাতা অর্থাৎ বিভিন্ন খাদ্য শস্যর বীজ মাটির সরাতে অঙ্কুরিত করিয়ে দ্বিতীয়া অথবা সংক্রান্তিতে পুজো দেওয়ার রীতি করম গাছের তলায়। নদিয়ায় এই কদম গাছের সংখ্যা খুব কম থাকলেও এই গ্রামে বহু পুরাতন একটি করম গাছ আছে যার ডাল পুঁতে অনুষ্ঠান হয়ে থাকে । তবে অন্যান্য জায়গায় করম গাছের অভাবে সুদূর পুরুলিয়া ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে জোগাড় করতে হয়। অথবা স্থানীয় কদম বা পাকুড় গাছের ডাল পুঁতে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হয় । এই গাছকে কর্মের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। তবে এর পিছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তিও রয়েছে যথেষ্ট ! এই গাছের মূলে গুটি বা অর্বুদের মধ্যে রাইবোজিয়াম ব্যাকটেরিয়া মাটিতে মিশে থাকা নাইট্রোজেন সংশ্লেষ করে। অন্যদিকে সেই পাতা শীতকালে ঝরে মাটিতে মিশে নাইট্রোজেনের মাত্রা বাড়ায় জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে। এই পুজো উপলক্ষে
ঐতিহ্যপূর্ণ সাবেকি রীতি বজায় রাখতে
নদীয়ার শান্তিপুর ব্লকের আরবান্দি একনম্বর পঞ্চায়েতের ছোট জিয়াকুড় গ্রামের আদিবাসীরা সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পরেও নাচগানের অনুশীলন চালায় নিয়মিত। মান্য রাজোয়ার নগেন মুন্ডা, অদ্বৈত রাজোয়ারদের বাদ্যযন্ত্র নেই ঠিকই কিন্তু পাশের গ্রামে অন্যদের বাজনা নিয়ে অনুশীলন করে থাকেন! অঞ্চলের তৃণমূল সভাপতি বিদ্যুৎ পালের কাছে, আবেদন জানিয়েছিলেন একটি মাদলের জন্য, স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য স্বপন রায়, প্রধান দিপালী দেবনাথের
সাথে আলোচনা করে একটি মাদলের ব্যবস্থা করেন সাথে অনুষ্ঠানের কিছু খরচও। আর তার ফলে খুশিতে মাতোয়ারা হয়েছে গোটা গ্রামের 125 টি আদিবাসী পরিবার। চাষের কাজ সেরে দিনের শেষে বিকালের সকলে সমবেত হয় মাটির সরাতে জাওয়াপাতা বিসর্জন করম গাছ রোপন, পুজো এবং নাচ গানের জন্য । প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য তা শুরু হয় সন্ধ্যার পর। পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য চন্দ্রশেখর দেবনাথ, ব্লক তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি কানাই দেবনাথ, সহ-সভাপতি কমল কান্তি ঘোষ উপস্থিত ছিলেন।
বাউল ,ঝুমুর, টুসু গানের গায়ক রঞ্জিত রায় জানান, একদিন কাজ না করলে খাওয়া জোটে না, ধামসা মাদল কিছুই ছিলো না, তবুও এ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে আদিবাসী সত্তা জাগ্রত করতে মাঝেমধ্যেই অনুশীলন করি আমরা।
নৃত্যশিল্পী ষাটোর্ধ্ব পুষ্পরাজোয়ার জানান, মা ঠাকুরমার কাছ থেকে নাচ শেখা, সরকারি ভাতা পাই কয়েকজন! সকলে পেলে ওদের আগ্রহ বাড়তো।
অপর এক নৃত্যশিল্পী স্বর্ণ রাজোয়ার বলেন, সরকারি অনুষ্ঠানে যেতে পারিনা মাত্র চারজনের নাচের দল! বাজনদার এবং আরো কয়েকজন নৃত্য শিল্পী ভাতা মঞ্জুর হলে, একটা বড়ো দল করতে পারব।
জাওয়া পাতা বিসর্জন ,পুজো, করম গাছ লাগানো, মাদলের তালে নাচ সবই হলো! হাড়িয়াই বা বাদ যাবে কেন! অনুষ্ঠানের শেষে নতুন গামছা দিয়ে চেলে প্রস্তুত করা হলো হাড়িয়া‌। ভাত থেকে প্রস্তুত এই উত্তেজক পানীয় খেয়ে আবারো চললো নাচ।